শুত্রুবার | ঢাকা ২৭ নভেম্বর ২০০৯ | ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪১৬ | ৯ জিলহজ ১৪৩০
সার্চ
আর্কাইভ
দিন :
মাস :
সাল :
গোলটেবিল বৈঠক
গোলটেবিল বৈঠক-এর আর্কাইভ
অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ
0.05%
 
গড় রেটিং:
 
রেটিং :
Bookmark and Share
বিশ্বব্যাপী মানুষের প্রাণের খেলা ফুটবল একসময় বাংলাদেশেও ছিল বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই সেই ফুটবল হারাতে থাকে তার সব আকর্ষণ ও জৌলুস। অর্থাভাবের সঙ্গে যোগ হয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের পরিকল্পনাহীন কার্যক্রম। ফলে ফুটবল হারিয়ে ফেলে নিজস্ব স্বকীয়তা, দর্শকরাও মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে মাঠ থেকে। মৃতপ্রায় সে ফুটবলকে আবার জাগিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে এবং জাগিয়ে তোলার সে যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশের কিংবদন্তি ফুটবলার কাজী মোঃ সালাউদ্দিন। স্টেডিয়ামের পথভোলা দর্শক আবার ঠাঁই নিতে শুরু করেছে গ্যালারিতে। ফুটবল ফুটবল কোলাহলের একটা আভা ছড়াতে শুরু করেছে চারদিকে। ফুটবলের ঘুরে দাঁড়ানোর এমন একটি সময়ে দৈনিক সমকালও শরিক হয়েছে গণমানুষের এ খেলাটিকে আবার জাগিয়ে তোলার মিছিলে। ফুটবলের সেকাল-একাল মিলিয়ে আগামীকালটা কেমন হতে পারে, তা জানার চেষ্টা করেছে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে। বাংলাদেশের ফুটবল : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ_ এ শিরোনামে গত ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা প্রাণবন্ত আলোচনা করেন। আলোচনার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হলো সমকালের পাঠকদের উদ্দেশে

জাহিদ আহসান রাসেল এমপি
সভাপতি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
বিষয়ক সংসদীয় কমিটি
কাজী মোঃ সালাউদ্দিন
সভাপতি, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন
এসএ সুলতান
সাবেক সাংসদ ও সাবেক সভাপতি
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন
ড. আনান্দ রাজাশিংহাম
হেড অব মার্কেটিং, সিটিসেল
গোলাম সারওয়ার
সম্পাদক
দৈনিক সমকাল
আল মুসাবি্বর সাদী
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন
লোকমান হোসেন ভূঁইয়া
সদস্য সচিব
মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব
মাহফুজা আক্তার কিরণ
সাধারণ সম্পাদিকা
বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা
মারুফুল হক
কোচ, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব
ইমতিয়াজ আহমেদ নকিব
সাবেক জাতীয় দলের ফুটবলার
আমিনুল হক
অধিনায়ক
জাতীয় ফুটবল দল
সঞ্চালক
রানা হাসান
সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার, সমকাল
সমন্বয়কারী
রফিকুল ইসলাম
সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার, সমকাল
ব্যবস্থাপনায়
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মাহবুব সরকার, জগন্নাথ বিশ্বাস, আতিকুল ইসলাম রিপন
ক্রীড়া বিভাগ, সমকাল
ইমরান কাদির
ইভেন্ট ম্যানেজার, সমকাল

আরও উপস্থিত ছিলেন
এস এম শাহাব উদ্দিন
নির্বাহী পরিচালক, সমকাল
আবু সাঈদ খান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, সমকাল
আবুল খায়ের চৌধুরী
মহাব্যবস্থাপক (বিজ্ঞাপন), সমকাল
আতিক আকবর
ডেপুটি ম্যানেজার মার্কেটিং, সিটিসেল
মাহবুব আজীজ
সহকারী সম্পাদক (ফিচার বিভাগ), সমকাল

কাজী মোঃ সালাউদ্দিন
সভাপতি
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন
ফুটবলের উন্নয়নের তাগিদ নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমকালকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি আজকের এ বৈঠকে আলোচনা শুরু করতে চাই বিকেএসপি প্রসঙ্গে লোকমান হোসেনের বক্তব্য দিয়ে। আমি মনে করি, আজকের আলোচনায় এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। আমার মনে হয়, বিকেএসপির পরিকাঠামো, পরিকল্পনা এবং পরিচালনা পদ্ধতির মধ্যেই ত্রুটি আছে। সেখানকার শিক্ষক, কোচ এবং পরিচালক কারোরই কোনো পরিষ্কার আইডিয়া নেই। পৃথিবীতে খেলাধুলা অনেক এগিয়ে গেছে, সেই তুলনায় বিকেএসপি পড়ে আছে গেঁয়ো মনোভাব নিয়ে। গত ২০ বছরে বিকেএসপিতে সাত-আটশ' কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এমন বিনিয়োগের পর আমাদের প্রাপ্তি কী? হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন ক্রিকেটকে আমরা খেলোয়াড় দিয়েছি। ক্রিকেটকে তো দিতে পারবেন, কারণ গোটা পৃথিবীতে ভালো ক্রিকেটার আছে ৪০০-৫০০ জন। পৃথিবীতে ২০০-এর বেশি দেশ আছে। আর ফিফার সদস্য দেশের সংখ্যা ২০৮। ক্রিকেটে আমরা হয়তো একদিন চ্যাম্পিয়নও হতে পারি। সম্ভাবনাও আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দেশগুলো ক্রিকেট খেলা ছেড়ে দিচ্ছে। জিম্বাবুয়েও এখন সেভাবে ক্রিকেট খেলছে না। ক্রিকেটের পৃথিবী ছোট। সেই ছোট প্রতিযোগিতায় তো আপনি জিতবেনই। বাস্তবতা বুঝতে শিখুন। ভারতীয় অর্থের কারণেই পৃথিবীতে ক্রিকেট খেলা হয়। এই খেলাটা ভারতকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।
বিকেএসপির অনেকেরই বড় বড় ডিগ্রি আছে, তাতে কিছু এসে-যায় না, কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অবদানের কথা ধরলে তারা কিন্তু জিরো। খেলাধুলার ক্ষেত্রে পৃথিবীতে কী ঘটছে, এ নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। একজন প্রতিভাবান কিশোরকে পরিচর্যা করে গড়ে তোলার কোনো পরিকল্পনাই নেই ওখানে। আমি বিকেএসপির দিকে তাকিয়ে থাকি প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার পাওয়ার জন্য। সরকারের কাছে সিলেট বিকেএসপি চেয়েছিলাম। সেটি পেলে আমি তা ফুটবলের কাজে লাগাতে পারতাম। এ জন্য আমি স্পন্সর জোগাড়ও করেছিলাম। স্পন্সর আমাকে ২৪ কোটি টাকাও দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা আমাকে নূ্যনতম আট বছরের জন্য লিজ নিতে বলেছিল সিলেট বিকেএসপি। আমি সে অনুযায়ী মন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠাই। সেই চিঠি চালাচালির ফলাফল হিসেবে বিকেএসপি কর্তৃপক্ষ আমাকে জানায়, তারা সিলেটে দুটি রুম বা ৫০টি সিট দিতে রাজি। কিন্তু আমার তো তা হলে হবে না। আমার ১৫০-২০০টি সিট দরকার। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে ২০০ ছেলে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর আমাকে ধরেই রাখতে হবে, ৫০ জন ঝরে যাবে। এভাবে যাচাই-বাছাই করার পর পাওয়া যাবে ফুটবল প্রতিভা। কিন্তু সেটি মানল না বিকেএসপি। তাই আমি সবিনয়ে তাদের ৫০টি সিটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম। আর আমি তো পুরো সিলেট বিকেএসপিই ফুটবলের জন্য চেয়েছিলাম, সেটি তো তারা দিতে চায় না। তাই শেষ পর্যন্ত আমি নিজ উদ্যোগেই একাডেমী করার পথে এগোচ্ছি। আমি এটি করে ফেলব।
প্রথমে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে। তৃণমূলে ফুটবল ছড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে আমি বলি, বাফুফের সভাপতি হওয়ার পর যেখানেই গেছি, যার সঙ্গেই দেখা হয়েছে, দেশ-বিদেশে মন্ত্রী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই বলেছে, সালাউদ্দিন সাহেব আপনি তৃণমূল পর্যায়ে যান। আমি প্রথম বছরে গ্রামে যাইনি। কারণ আছে। সেখানে হয়তো আমি খেলার আয়োজন করলাম। দুই-তিন বছর তারা খেলল। তারপর সেই ছেলেটা কী করবে? আমি তাদের বলেছি, গ্রামে অবশ্যই যাব, তবে এখন নয়; বছর দুই পরে। আগে আমি ঢাকার ফুটবলটা গুছিয়ে নিই। কারণ ঢাকা হলো ফুটবলের শোকেস। তাই সবার আগে ঢাকার ফুটবলের উন্নয়ন করতে হবে। এরপর আমাকে গ্রামে যেতে হবে। সে সময় গ্রামের একটি ছেলে যখন ফুটবল খেলতে শুরু করবে, তখন তার সামনে একটি লক্ষ্য থাকবে। তা হলো ভালো খেলে ঢাকার ফুটবলে নিজের অবস্থান পোক্ত করা। যেমন জাহিদ হাসান এমিলি এবার প্রায় ১৯ লাখ টাকা ক্লাব থেকে পেয়েছে। সে রকম তৃণমূল পর্যায়ের একজন খেলোয়াড়ের লক্ষ্য থাকবে, আমি ঢাকায় গিয়ে ১৯ লাখ টাকা পাব, অর্থাৎ এটি হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
খেলতে চাই ঢাকার সেই মাঠে, যেখানে মোহামেডান-আবাহনীর মতো বড় দলগুলোর খেলা হয়। কিন্তু ঢাকা লীগ যদি বন্ধ থাকে তাহলে সেই উদ্দীপনাটা আসবে না নবীন খেলোয়াড়দের মধ্যে। এটি খুবই সহজ হিসাব। তাই বিকেএসপিকে কাজে লাগাতে হলে পুরো সংস্থাটিকেই পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে। সারাদেশে ক্যাম্পেইন চালিয়ে খেলোয়াড় সংগ্রহ করতে হবে, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটি অনেকটা মুরগির ফার্মের মতো। এ ক্ষেত্রে বিকেএসপিকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। বর্তমানে যেভাবে চলছে, সেভাবে এটা চলতে পারে না। এভাবে চললে এটি থেকে সে রকম কোনো ফলাফল আমরা পাব না।
লোকমান হোসেনকে একটি বিষয় আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই। তিনি অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-১২, অনূর্ধ্ব-১৪ দলকে বাফুফের অধীনে প্রশিক্ষণ দিতে বলেছেন। কিন্তু পৃথিবীর কোনো দেশে এটি করা হয় না। এটি একটি ভুল ধারণা। শুধু বাংলাদেশেই বাফুফে দায়িত্ব নিয়ে থাকে। ওনারা বলছেন, ক্লাবগুলোর অর্থ নেই। আমাদের কাছেও তো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। আমরা কীভাবে পারব?
ক্রিকেটের উদাহরণ দিলে হবে না। একসময় ফুটবলে স্টেডিয়াম উপচেপড়া দর্শক ছিল, কিন্তু এখন নেই। ক্রিকেটে এত দর্শক কিন্তু কখনোই ছিল না। এই দর্শক কমে যাওয়ার পেছনে তাই মাঠে ফুটবল খেলা না থাকাটাই মূল কারণ বলে আমি মনে করি।
আমি আপনাদের বলব, চলুন সবাই মিলে এ জন্য চেষ্টা করি। যদি সেখানকার পুরো ব্যবস্থাটি আমরা নিজেদের মতো করে চালাতে পারি, তবেই সম্ভব নতুন নতুন ফুটবলার বের করে আনা। এ ক্ষেত্রে সবার সহায়তা কাম্য।
কোচ মারুফুল হকের পরামর্শটি ভালো। কিন্তু ইন্সট্রাক্টরের টাকা আপনি কীভাবে দেবেন? আর ৩৫শ'-৪ হাজার ডলারে ভালো কোচ আপনি পাবেনও না। আমি নিজে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগ করে দেখেছি, ৮-১০ হাজার ডলারের নিচে ভালো কোনো কোচ পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে যদি চার হাজার ডলারের মধ্যে কোনো ভালো কোচ আপনি এনে দিতে পারেন, তাহলে তার বেতন দিতে আমি রাজি আছি। আগে কী হয়েছে, তা বলে তো লাভ নেই। বলতে হবে বর্তমান সময়ের কথা। ক্লাব কোচিংয়ের বিষয়টি পুরোপুরি ক্লাব কর্তৃপক্ষের ওপরই নির্ভর করে। তারা তাদের পছন্দমতো কোচ নিয়োগ দেন। এখানে তারা আমার বা বাফুফের কথা শুনবেন না। এটাই স্বাভাবিক।
আমি এসেছি দুই বছরও হয়নি। আমি আসার আগে মাঠে ফুটবল ছিল না। আমি মাঠে ফুটবল ফিরিয়ে এনেছি। আমাকে দুটি বছর সময় দিন, দেখুন আমি ফুটবলের উন্নয়নে যা যা করার দরকার, সবই করব। আরেকটি কথা, বাফুফে কিন্তু সরকারের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের মর্জিমাফিক আমাকে চলতে হয়। সরকার আমার স্পন্সর। সরকার আমাকে টাকা দেয়। সরকারের কাছ থেকে ৫-৬ কোটি টাকা আমি আনতে পারি। সুপার কাপ, পেশাদার লীগ করতে পারি।

ড. আনান্দ রাজাশিংহাম
হেড অব মার্কেটিং
সিটিসেল
আমি ফুটবলকে ভালোবাসি। আমি ফুটবলের এতটাই ভক্ত যে, যখন আমরা বিয়ে করি, বিয়ের অনুষ্ঠানেই আমি এবং আমার স্ত্রী ফুটবলের জার্সি অদল-বদল করি। আমার বাসায় একটি নির্দিষ্ট দেয়ালে আমার সব প্রিয় ফুটবলারের ছবি টানানো রয়েছে। ফুটবলের প্রতি আমার অনুরাগ বোঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। গোলটেবিল বৈঠকের বিষয়_ বাংলাদেশের ফুটবল : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। আমাকে যদি বলা হয়, আমি কি বাংলাদেশের এই ফুটবলে সন্তুষ্ট? সিটিসেলের দৃষ্টিকোণ থেকে বলব, হ্যাঁ, আমরা চালিয়ে যেতে চাই। তবে আজ আমি সিটিসেলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন ফুটবল ভক্ত হিসেবে বুঝতে পারছি, আজকের এই আলোচনায় ফুটবলের কোচিং ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। দেখুন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ ফুটবলের শেষ আটে খেলেছে। তাদের ফুটবলের ভিত্তি হচ্ছে অল্প বয়সী খেলোয়াড়রা। ছোটবেলায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাবা-মায়েরাই কোচের দায়িত্ব পালন করেন। অথচ তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো কোচ নন। তারপরও তারা বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করছেন। তাদের খেলোয়াড়রা ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের লীগে খেলছে। সে কারণে তারা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও খেলতে পারছে। কীভাবে এটা হচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রে তৃণমূল পর্যায়ে কোচিং লাইসেন্স নেই, সেটা গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আপনার খেলার ধৈর্য আছে কি-না। কীভাবে একজন লোক ভালো কোচ অথবা একজন ভালো শিক্ষক হবেন? বিশ্বের এমন সেরা শিক্ষকদের কয়েকজন লিখতে-পড়তে পারতেন না। কিন্তু তারা শেখাতে পারতেন। কীভাবে এই লোকগুলো এই বিদ্যা অর্জন করেছেন? এটি সম্ভব। আমি যদি সালাউদ্দিন হতাম তাহলে আমার স্বপ্ন থাকত, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতবে। এ জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, হাঁটা শেখার আগেই যাতে দৌড়ানোর চেষ্টা না করি। তা যদি হয় পড়ে যাবেন, নিরুৎসাহিত হবেন। আপনি আর উঠে দাঁড়াতে পারবেন না এবং হাঁটার চেষ্টা করতে পারবেন না। তাই সালাউদ্দিনের মতো বলতে হয়, প্রথমে আপনার স্বপ্ন, লক্ষ্য ও পরিকল্পনা থাকতে হবে, আপনি কোথায় যেতে চান। ছোট ছোট আর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার? প্রথমে এগুলো ঠিক করেন। এরপর ফুটবলের অবকাঠামো, কোচিং পদ্ধতি এবং অন্যান্য বিষয়ের দিকে তাকান। আপনার যা আছে তা নিয়েই বাস্তববাদী হতে হবে। আমি বলতে পারি না বাংলাদেশ ফুটবলের অতীত কী? আমি মাত্র দু'বছর ধরে বাংলাদেশে আছি। একদিন গুলশান থেকে সোনারগাঁওয়ে আসার পথে দেখলাম, ছেলেরা কিছু একটা দিয়ে বল বানিয়ে রাস্তায় খেলছে। আমি গুলশান এসে একটি বল কিনে নিয়ে তাদের কাছে গেলাম। কিছু সময় তাদের সঙ্গে খেললাম। তারা ইংরেজি বলতে পারে না, আমি বাংলা বলতে পারি না। কিন্তু যে সময়টুকু কাটিয়েছি তা ছিল দারুণ। এটাই হচ্ছে ফুটবলের জন্য মানুষের ভক্তি। আমি জানি, ক্রিকেট বাংলাদেশে জনপ্রিয়। দুটি আলাদা খেলা। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট, ফুটবল, হকি এবং সাঁতারে বিশ্বমানের। তাহলে বাংলাদেশের ফুটবলে উন্নতি না করার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশেও ফুটবলের অবকাঠামোর জন্য অনেক স্পন্সর থাকতে পারে। আমি এটা ফুটবলভক্ত হিসেবে বলছি, সিটিসেলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়। আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

আল মুসাবি্বর সাদী
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন
আমাকে এখানে ডাকার জন্য ধন্যবাদ সমকালকে। সংগঠক হিসেবে ফুটবলের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলেও সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘকাল ফুটবলের সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে। তবে ফেডারেশনে এসে প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে হচ্ছে আমাকে। আমার মনে হয়, ফুটবলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এখন সংগঠনের ঠিক জায়গায় ঠিক লোকটিকে বসানো। আমার কাছে পেশাদারিত্বের অর্থই এটা, আমি সালাউদ্দিন ভাই এবং লোকমান ভাইয়ের ধারণার সঙ্গে একমত। আমিও চাই, ঠিকভাবে আমরা যেন বয়সভিত্তিক দলগুলো তৈরি করি। যদিও পেশাদার লীগ চালু হয়েছে; কিন্তু এখন দরকার ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক কয়েকটি দল। অনূর্ধ্ব-১৪ থেকে ২০ পর্যন্ত কয়েকটি দল প্রত্যেক ক্লাবের থাকলে খেলোয়াড় তুলতে সুবিধা হবে। বিভিন্ন বয়সের খেলোয়াড় তৈরি এবং পরিচর্যা করা ক্লাবের দায়িত্ব। এরপর জাতীয় দল সেখান থেকে খেলোয়াড় নিয়ে দল গঠন করবে। এতে করে ক্লাব তার খেলোয়াড়ের অভাব মেটাতে পারবে। তবে আমাদের যা আর্থিক অবস্থা, তাতে করে একসঙ্গে এতগুলো বয়সভিত্তিক দল তৈরি করা সম্ভব হবে না। তবে দু'একটা দল কিন্তু আমরাই তৈরি করতে পারি। যত নিচের দিক থেকে শুরু করব, ততই মঙ্গল। তবে এতে একটি অসুবিধা হবে। ১০-১১ বছর থেকে শুরু করলে ওই খেলোয়াড়দের ক্লাবে খেলার উপযুক্ত করতে বেশি সময় এবং অর্থের প্রয়োজন হবে। মূল কথা, আমাদের উন্নত দেশের মতো ক্লাব কালচার গড়ে তুলতে হবে। এখন যেমন লীগ শুরু করতে সমস্যা হচ্ছে, তেমনি জাতীয় দলের জন্য ক্লাবগুলো খেলোয়াড় ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। কিংবা আজ ক্লাবের হয়ে মাঠে নামার দু-তিন দিন পরই জাতীয় দলের হয়ে খেলার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এ সমস্যাগুলো ক্লাবের ফুটবলার তৈরির পদ্ধতি থাকলে হতো না। পৃথিবীর কোনো দেশেই এমন সমস্যা নেই। এর সমাধানের জন্য বয়সভিত্তিক দল তৈরি করা উচিত।

গোলাম সারওয়ার
সম্পাদক
দৈনিক সমকাল
আপনাদের সকলকে সুস্বাগতম। আমি বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি ড. আনান্দ রাজাশিংহাম সাহেবকে আমাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য। আমরা আনন্দিত বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জীবন্ত কিংবদন্তি কাজী সালাউদ্দিনও আমাদের মাঝে আছেন। একই সঙ্গে আপনাদের উপস্থিতিতে সমকাল পরিবার গর্বিত এবং আমরা আশা করছি, আপনাদের মূল্যবান বক্তব্য ও দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশের ফুটবলও উপকৃত হবে।
আমাদের সকলেরই একটা শঙ্কা ছিল যে, ফুটবল মনে হয় আমাদের সবার কাছ থেকে দিগন্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং খুশি এই জন্য যে, সালাউদ্দিন ভাই, তিনি ফুটবলের হাল ধরেছেন এবং অত্যাশ্চর্য এই জন্য যে, তার আগমন এবং ফুটবলের প্রতি বর্তমান সরকারের বিশেষ সমর্থনের কারণে আমার মনে হচ্ছে, ফুটবল তার হারিয়ে যাওয়া গৌরব আবার ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে। আর যদি আমরা ক্রিকেটের কথা বলি আমার এখনও মনে হয়, ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলের আকর্ষণ এবং জনপ্রিয়তা সারা দুনিয়ায় অনেক অনেক গুণে বেশি।
আমার মনে হয়, ফুটবলের ব্যাপারে আমাদের হারিয়ে যাওয়া উৎসাহ আবার ফিরে এসেছে। আমরা প্রত্যাশা করব, সালাউদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বে এবং আপনারা যারা এখানে উপস্থিত আছেন, সবার সহযোগিতায় ফুটবল তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। সে ক্ষেত্রে ফুটবলের পুনর্জাগরণে সমকাল অবশ্যই সবসময় ফুটবলপ্রেমীদের সঙ্গে আছে।
আমার অত্যন্ত জরুরি একটা সভা ছিল। আমি এখন টেলিফোন বন্ধ করে রেখেছি। কয়েকবার আমাকে ফোনও করা হয়েছে। দুটি কারণে আমি গেলাম না। একটা হচ্ছে, এ আলোচনা ছেড়ে যেতে আমার ইচ্ছা হচ্ছিল না এবং ওই সভাটি হয়তো আরেক দিন হবে। কিন্তু এমন গোলটেবিল বৈঠক হয়তো আর কখনোই পাওয়া যাবে না।
প্রাণবন্ত আলোচনায় অনেক কিছু এসেছে। এর মধ্যে বিকেএসপি প্রসঙ্গে আমার কিছু কথা রয়েছে, যা শুনলাম তাতে অচিরেই এই প্রতিষ্ঠানটি শ্বেতহস্তীতে রূপান্তরিত হবে। একে পালন করার কোনো যুক্তি নেই বলেই আমি মনে করি। বিকেএসপিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কথা উঠেছে। সেটা করা সম্ভব কি-না জানি না। বিকেএসপিকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে গড়া হয়েছে, সেটি সফল করার জন্য কী করা দরকার তা-ও বের করা প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানটির সাফল্য কতটুকু?
আরেকটি ব্যাপার হলো, সংসদ সদস্য এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ আহসান রাসেল এখানে আছেন। স্ট্যান্ডিং কমিটি হচ্ছে ওয়াচডগ। সংসদ অচল, কিন্তু স্ট্যান্ডিং কমিটি সচল। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে যান না, কিন্তু স্ট্যান্ডিং কমিটিতে অংশগ্রহণ করেন। আমি জানি, স্ট্যান্ডিং কমিটির সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করার বাধ্যবাধকতার আইন নেই। তবে থাকা উচিত। আমি জানি, জাহিদ আহসান রাসেল তরুণ ও উদ্যমী এবং খেলার প্রতি অনুরাগী। আমরা প্রত্যাশা করব, যে প্রসঙ্গগুলো এখানে এলো, সরকারের দিক থেকে যা করণীয় আপনি অবশ্যই চেষ্টা করবেন। আর প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে একটা কথা বলব, তাকে আমরা সবাই জানি ক্রিকেট অনুরাগী হিসেবে। বাংলাদেশ দল যাতে জিতে, সে জন্য জায়নামাজে বসে দোয়া করছেন_ এ রকম ছবিও আমরা ছেপেছি। আমরা আশা করব, তিনিও ফুটবলমনস্ক হবেন।
ছোটবেলায় কে না ফুটবল খেলেছে। আমরা পারি আর না পারি, লুঙ্গি পরে হলেও খেলেছি। আমার এখনও মনে পড়ে, একবার নদীর এপার-ওপার খেলা হয়েছিল। খেলার মাঠে ভয়ঙ্কর মারধর। আমরা সবাই নদী সাঁতরে পালিয়ে এসেছিলাম। পরে দুই মাস ওপারের লোক এপারে আসতে পারেনি, এপারের লোক ওপারে যেতে পারেনি। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো যুদ্ধও হয়েছে কোথাও কোথাও।
সালাউদ্দিন ভাইকে কিংবদন্তি বলেছি তাকে খুশি করার জন্য নয়। আসলে সত্যি সত্যিই তিনি কিংবদন্তি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যারিশমা প্রয়োজন। ব্যক্তি ক্যারিশমায় অনেক কিছুই সম্ভব। অনেক আয়োজনও ব্যর্থ হয়ে যায় যদি ব্যক্তির প্রচেষ্টা না থাকে। একমাত্র সালাউদ্দিন ভাইয়ের পক্ষেই সম্ভব, যে ভিশনের কথা বলেছেন তা বাস্তবায়ন করা। সিটিসেলের ড. রাজাসিংহাম, আপনি খুব ভালো কথা বলেছেন। আমরাও আপনার সঙ্গে একমত যে, ফুটবলের জন্য লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, সে ভিশনটা বাস্তবায়ন সম্ভব সালাউদ্দিন ভাইকে দিয়ে। আমাদের 'এ' ও 'বি' লাইসেন্সধারী অনেক কোচ যারা বিভিন্ন ক্লাবে বা বয়সভিত্তিক দলে আছেন, তাদের ক্ষেত্রে একটি অভিযোগ আছে যে, তারা তাদের সম্পূর্ণ দক্ষতাটুকু খেলোয়াড়দের পেছনে ব্যয় করেন না। তাহলে আমরা কীভাবে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় পাব?
আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। যানজটের ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে আপনারা আমাদের এখানে এসেছেন। কাজী সালাউদ্দিন সাফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাকে আবারও অভিনন্দন।


ইমতিয়াজ আহমেদ নকিব
জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার
আমাকে এই গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলতে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ সবাইকে। আমি কিন্তু কিছুদিন আগেও ফুটবলার ছিলাম। ২০০৭ সালে খেলা থেকে অবসর নিই। ফুটবলে বড় এক সমস্যা অনিয়মিত লীগ। আমার ক্যারিয়ারে চার বছর আমি ঢাকা লীগই পাইনি। তাই সালাউদ্দিন ভাইয়ের কাছে আমার প্রশ্ন, তার ক্যারিয়ারে কোনো গ্যাপ ছিল কি-না? মাঠে নিয়মিত খেলা না রাখলে ফুটবল এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান অবস্থা তারই প্রমাণ। আমাদের মাঠে দর্শক কমে যাওয়ার ঘটনার প্রতিকার কী, তাও বের করতে হবে।

লোকমান হোসেন ভূঁইয়া
সদস্য সচিব
মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব
আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য মোহামেডানের পক্ষ থেকে সমকালকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। অতীতকে নিয়ে আসলে আমাদের আলোচনার কিছু নেই। একটা কথাই শুধু বলব, সালাউদ্দিন ভাইরা যখন ফুটবল খেলেছিলেন, তখনকার এবং আশির দশক পর্যন্ত যারা ফুটবল খেলেছেন তাদের দুর্ভাগ্য যে, ইউরোপে জন্ম হয়নি তাদের। ওখানে হলে তারা বিশ্বকাপ খেলতে পারতেন। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত।
বর্তমানের কথা বলতে গেলে তিন কোটি টাকা দিয়ে আমি একটা দল গড়েছি। ফেডারেশন কাপে একটি জেলা দলের (নারায়ণগঞ্জের শুকতারা) সঙ্গে আমাদের জিততে হয়েছে কোনোমতে। আমি মাঠে বসেই খেলা দেখেছি। আমাদের বর্তমান ফুটবলের এখন এই অবস্থা। আমরা যতই টানাটানি করি, এভাবে উন্নতি করতে পারব না। সালাউদ্দিন ভাই হয়তো আমার কথায় অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু আমরা ক্লাব চালাই, আমরা বুঝি। ফুটবলের মান ভালো না করতে পারলে আমরা কিন্তু মাঠে দর্শক আনতে পারব না। ফেডারেশন কাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি খেলায় মাঠে কিন্তু দর্শক একেবারেই হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনালে আমাদের গ্যালারিতে পাঁচ-সাত হাজার দর্শক আমরা দেখেছি। এর আগে মোহামেডান ৪, ৫ এমনকি ৮ গোলে পর্যন্ত জিতেছে। এই খেলায় দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল, ভালো খেলা দেখার। তাই তারা মাঠে এসেছেন। কিন্তু ভালো খেলা খেলতে গেলে ভালো খেলোয়াড় প্রয়োজন। আমাদের হাতে এ মুহূর্তে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কিন্তু সে রকম কোনো খেলোয়াড় নেই। ভালো খেলোয়াড় আমাদের তৈরি করতে হবে। সে জন্য আমি আসতে চাই ভবিষ্যতের কথায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের কিছু ভালো খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে।
সুলতান ভাই যেটা বললেন, স্কুল ফুটবল শুরু হয়েছে। তারপরও সরকারের একটা দায়িত্ব আছে। ভালো ফুটবল খেলোয়াড় তৈরি করতে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোনো ছাড়া সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ সালাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে আমি কয়েকবার কথা বলেছি বিকেএসপির ব্যাপারে। সরকারের ওপর চাপ দিন এটাকে প্রাইভেট করে দিতে। তাহলে খেলোয়াড় তৈরি হবে। আমার কাছে অনেক তদবির আসে। যারা পড়াশোনা করে না তারা আসে। ক্রিকেটে, হকিতে ভালো টিম থাকলেও ফুটবলের ভালো টিম তৈরি হয়নি। বিকেএসপির যে সুযোগ আছে, তারা চাইলে বছরে ১০ হাজার ফুটবলার তৈরি করতে পারে।
এ সুযোগটা কিন্তু কোনো ক্লাবের নেই। অনূর্ধ্ব-১৬ বা অনূর্ধ্ব-২০ দল গঠন করার মতো আর্থিক সঙ্গতি বাংলাদেশের কোনো ক্লাবেরই নেই। আমাদের ক্লাবগুলো চলে বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতায়। কিন্তু ফুটবলের উন্নয়নের জন্য ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা দরকার। ফুটবল ফেডারেশনকে আমি অনুরোধ করব, আপনারা বয়সভিত্তিক দল গঠন করেন। এক সময় দেখা যায়, জাতীয় দল আমাদের ক্লাবের দলের কাছে হেরে যায়। আমি মনে করি, ক্লাবগুলোই খেলোয়াড় তৈরির সর্বোত্তম জায়গা। আর এ জন্য বয়সভিত্তিক দল গঠনের কোনো বিকল্প নেই। আপনারা দেখেছেন, কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েও আমরা শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারিনি শুধু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। আমি অনুরোধ করব, আপনারা এদিকে নজর দেন, যাতে ভবিষ্যতে আমরা ফুটবলার তৈরি করতে পারি। আমার মনে হয়, সেই পরিকল্পনাগুলো করলেই ভালো হয়। এখানে আমি দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের কথা বলেছি। ক্লাব থেকে করতে পারছি না বলেই আমি বাফুফেকে এটি করতে বলছি। আমাদের অবশ্যই শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে ফুটবলের জন্য। এ জন্য সিলেট বিকেএসপি যদি পাওয়া যায় তবে আরও ভালো। ধন্যবাদ সবাইকে।

মাহফুজা আক্তার কিরণ
সাধারণ সম্পাদিকা
বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা
আজকের গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতি, উপস্থিত সাংবাদিক ভাইয়েরা, উপস্থিত সিটিসেল এবং ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতিসহ সবাইকে ধন্যবাদ। আমি খুব কম কথায় ফুটবলের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বলব। মহিলা ফুটবল শুরু হয়েছিল ২০০৩-এ। আপনারা সবাই জানেন, একটি কি দুটি খেলার পরই সেই মহিলা ফুটবলের আর কোনো গতি ছিল না। বন্ধ ছিল। কোনো টুর্নামেন্ট ছিল না। কোনো প্লেয়ার ছিল না। তখন যে খেলোয়াড়রা ছিল, একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা মহিলা ক্রিকেটে চলে গেছে। আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছি এবং যখন বাফুফের মহিলা কমিটিতে এলাম, তখন আমাদের কোনো মহিলা প্লেয়ার ছিল না। তখন আমাদের এখানে একটা মৌলবাদী সমস্যা ছিল। তা কাটিয়ে ওঠার জন্য আমরা প্রথমেই শুরু করলাম ২০০৮-এ মহানগর স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ। দায়িত্ব নিয়ে দেখলাম, আসলে আমাদের যে মেয়েরা আছে, তারা গ্রামগঞ্জ থেকে আসত। অর্থাৎ সমাজের একটা নিচুস্তর থেকে। এতে দেখা যায়, শহরের মায়েরা তাদের বাচ্চাদের খেলতে দিতে চাচ্ছেন না। ওরা এটা শ্রেণী বিভাজন করছে। তো সেই পার্থক্যটা দূর করার জন্য এবং সবাইকে খেলায় নিয়ে আসার জন্য আমরা সিরিজ অব মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম করেছি। আমি নিজে আমার দল নিয়ে স্কুল অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের উদ্বুদ্ধ করি। সেটা ছিল মেয়েদের মহানগর স্কুল টুর্নামেন্ট। আমরা বাফুফেতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিয়ে সাত-আটটি বৈঠক করেছি। মোটিভেশন দেওয়ার পরে আমরা ভালো সাড়া পেলাম। শুরু করলাম ২০০৮-এ মহানগর স্কুল টুর্নামেন্ট।
সাংবাদিক ভাইরা এখানে আছেন। তাদেরও যথেষ্ট চেষ্টা ছিল সেটা প্রচারের জন্য। খুব সফলভাবে আমরা সেটা করি। তারপর আমরা ২০০৯ সালেও একই টুর্নামেন্ট করি। সেখানেও যথেষ্ট অংশগ্রহণ ছিল। সেখানে আরেকটু বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছিলাম আমি। সেটা হচ্ছে, আমাদের পুরান ঢাকা একটু রক্ষণশীল। আমরা যখন স্কুলগুলো পছন্দ করেছিলাম, তখন এলাকা অনুযায়ী নিয়েছিলাম। কিছু বাংলা মিডিয়াম, কিছু ইংলিশ মিডিয়াম বেছে নিই। যাতে সব পর্যায়ের অংশগ্রহণ থাকে। দ্বিতীয়টাতে আমরা সেটি করেছি এবং সেটি অনেক বেশি সফল ছিল। এরপর আমরা চিন্তা করলাম, আমাদের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। যেহেতু শারীরিক সক্ষমতার একটা ব্যাপার আছে মেয়েদের, সে জন্য আমরা চলে গেলাম পাহাড়ি এলাকায়। বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এই এলাকায় আমরা এক-দেড় মাসের একটা প্রশিক্ষণ করলাম ৪৫ জন খেলোয়াড় নিয়ে। সেই প্রশিক্ষণেই আমরা ভালো সাড়া পেলাম। আমাদের বেশ কিছু ভালো খেলোয়াড় বেরিয়ে এলো। তারপর আমরা চিন্তা করলাম, আমাদের জাতীয় দল নেই। আমাদের সামনে এসএ গেমস আর মহিলা ফুটবল নিয়ে অনেক বড় পরিকল্পনা রয়েছে, বিশেষ করে বাফুফে সভাপতির। আমি বলব, আমার কমিটি কাজ করতে পারছে আমাদের সভাপতির কারণেই। তার এত বেশি সহযোগিতা, যা চিন্তাই করা যায় না। মহিলা ফুটবলের জন্য কোনো কিছু চেয়ে পাইনি, এটা বললে অন্যায় হবে। আমি যখন এসেছি, মহিলা ফুটবলের একটা বসার জায়গাও ছিল না। আমি সভাপতিকে সব বললাম। এখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তিনতলায় মহিলা ফুটবলের খুব ভালো একটা রুম আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ওই রুমের সব জিনিসই সভাপতির রুমের। তার টিভি, তার এসি সব দিয়েই ওই রুমটা করা। তার কতটা সহযোগিতা আছে, এটা থেকেই বোঝা যায়।
তারপর আমরা ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপটা করলাম। ওখানে আমাদের ২৫টি দল অংশগ্রহণ করেছে। এটা তো মহিলা ফুটবলের জন্য বিশাল একটা মাইলফলক আমি বলব। সেখান থেকে আমরা প্রায় ৩৪-৩৫ জনের একটা দল করে এখন এসএ গেমসের জন্য প্রশিক্ষণ করছি। এসএ গেমসে যাতে ভালো করতে পারি, এ জন্য আমরা সুপার ফোরও চালু করেছি। মহিলা ফুটবল দলটা যাতে আরও ভালো পারফর্ম করতে পারে, সে জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমরা তাদের পশ্চিমবঙ্গে পাঠাচ্ছি। এরপর আমরা নেপালে পাঠাব। এই হচ্ছে বর্তমান অবস্থা। আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমি যেটা মনে করি, এ জন্য খুব ভালো পরিকল্পনা দরকার। সঠিক দিকনির্দেশনা ও আর্থিক সহায়তা দরকার। পরিকল্পনার জন্য আমাদের সভাপতি যথেষ্ট বলেই আমি মনে করি। আর আর্থিক সহায়তার জন্য আমাদের সবাইকে চেষ্টা করতে হবে।
আমি আমার পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছি স্পন্সর আনার জন্য। যেহেতু রাসেল ভাই এখানে আছেন, উনি আমাদেরই এমপি। আমি সরকারের কাছে একটি মেসেজ দিতে চাচ্ছি। খুবই দুঃখের কথা যে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন একটা টাকাও সরকারের কাছ থেকে পায় না। এ ক্ষেত্রে সরকারের আসলে অনেক বড় ভূমিকা রাখা উচিত। আর মহিলা ফুটবল নিয়ে যে কথাটা রানা ভাই বললেন, বিশ্বকাপে যাওয়ার সম্ভাবনা আমাদের আছে। বাংলাদেশে এখন যে মহিলা ফুটবল দলকে আমরা জাতীয় ফুটবল দল হিসেবে তৈরি করছি, সে দলটি অনেক উন্নতি করছে। অনেক ভালো একটা দল হতে যাচ্ছে। সেখানে তাদের যথাযথ পরিচর্যা যদি আমরা না করি তাহলে একটা সময় বন্ধ হয়ে যাবে।
সে ক্ষেত্রে বাফুফের কোনো ত্রুটি নেই। বাফুফের যথেষ্ট চেষ্টা আছে। পাশাপাশি সরকারের কিছু সাপোর্টও আমাদের লাগবে। আর একই সময়ে ক্লাবগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। যেন পুরুষ ফুটবলের পাশাপাশি মহিলা ফুটবলের জন্যও তারা কাজ করে। আমি বাংলাদেশে প্রথম মহিলা করপোরেট লীগ করতে যাচ্ছি আগামী মাসে। আপনারা দোয়া করবেন। কিন্তু এটার জন্য ধারাবাহিকতা যেখানে থাকতে হবে, সেখানে কিন্তু আমাদের ক্লাবের সাপোর্ট দরকার হবে। তো সবাইকে আবারও ধন্যবাদ। মহিলা ফুটবলে আপনাদের দিক থেকে সহযোগিতা থাকবে, এটাই আশা করি।

মারুফুল হক
ফুটবল কোচ
মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব
ফুটবলের জন্য এটি একটি মহতী উদ্যোগ। আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সালাউদ্দিন ভাইয়ের মতো লিজেন্ডের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আলোচনার সুযোগ করে দেওয়ায় সমকাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। লোকমান ভাই বললেন, ছোট দলের বিপক্ষে জয় পেতে মোহামেডানের কষ্ট হয়েছে। এটি কিন্তু একটি ইতিবাচক দিক। অর্থাৎ সব দলের মধ্যেই প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ইউরোপে দেখবেন, ১ নম্বর দল ১৯ নম্বর দলের কাছেও হারছে। এটি নিয়ে কিন্তু কেউ প্রশ্ন তোলেন না। কারণ, সেখানে প্রতিযোগিতার ধরনই এটি। যে কোনো দলই হারতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি দলেরই উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই ঘটনা খুব একটা ঘটে না। এটি একটি কারণ। আরেকটি কারণ হলো, কোচের সংখ্যা ও তাদের মান। আমাদের দেশে ২০০৭ সাল পর্যন্ত 'বি' লাইসেন্সধারী কোচের সংখ্যা ৩১, এ লাইসেন্সধারী মাত্র দু'জন এবং 'সি' লাইসেন্সধারীর সংখ্যা ছিল ৪৩ জন। অন্যদিকে যে মালদ্বীপকে আমরা ৭-৮ গোলে হারাতাম, তাদের এ লাইসেন্সধারী কোচ ১১ জন। ২০০৭ সালের পর আমাদের দেশে আর কোচিং কোর্স হয়নি। এটি আমাদের দুর্ভাগ্য। যদি আমাদের মানসম্পন্ন কোচের সংখ্যা না বাড়ে, তবে ফুটবলারদের মানোন্নয়ন হবে না। এ দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোচদেরও বিশ্ব ফুটবল সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে হবে এবং এটি যদি না হয় তবে সেটি হবে তাদের ব্যর্থতা। আবার আমরা যেসব কোচ ক্লাব বা বয়সভিত্তিক দলে নিয়োজিত আছি, তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এটিও খেলার মনোন্নয়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে আরেকটি কথা বলতে চাই। সেটি হলো বাফুফের কোচিং কোর্স নিয়ে। এ ক্ষেত্রে আমি একজন এএফসির ইন্সট্রাক্টর চাই। এটি যদি হয় তবে আমরা অনেক ভালো মানের কোচ তৈরি করতে পারব। সাড়ে তিন থেকে চার হাজার ডলারেই একজন ইন্সট্রাক্টর পাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। অন্যান্য খাতে কৃচ্ছ্রসাধন করে কোচদের বেতনের সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে।
এখানে আমি একটু যোগ করতে চাই, লাইসেন্সধারী কোচরা যদি তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা না করেন, তবে দায়ী কিন্তু তারাই। এ ক্ষেত্রে কোচিং কোর্স যে ব্যবস্থায় করানো হয়, সেটিরও গলদ আছে। একটি লাইসেন্স করতে সময় লাগে ১৫ দিন, কিন্তু পুরো বিষয়টি রপ্ত করতে লাগে এক মাস। আবার 'বি' লাইসেন্স করানো হয় তিন সপ্তাহে। কিন্তু একজন কোচের এখানে সামগ্রিক বিষয় আয়ত্ত করতে লাগে দু'মাস। 'এ' লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও একই কথা। বাফুফেতে খুব দ্রুততার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময়ে কোর্সগুলো সম্পন্ন করা হয়। শুধু প্রধান বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পরই পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষ করে লাইসেন্স পাওয়ার পর কোচরা আর কোর্স থেকে রপ্ত করা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেন না। গতানুগতিক ধারায় সেই আগের মতো করেই আমরা খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিতে থাকি। ফলে খেলোয়াড়দের আর উন্নয়ন হয় না। তাই আমি বলতে চাই, বাফুফে যদি একটি কোচের কোর্স খুব ভালো করে পরিচালনা করে, তাহলে কোচ-খেলোয়াড় সবাই উন্নতি করবেন।
আমার মনে হয়, বাফুফে এই কোচের এডুকেশন কোর্স খুললে বাফুফের অতিরিক্ত খরচ খুব বেশি হবে না। এ ক্ষেত্রে আমার একটি কথা আছে। আমরা যদি জেলা-উপজেলায় একজন করে কোচ রাখতে পারি তাহলে কিন্তু এই সমস্যা আর হবে না এবং এতে টাকাও কম খরচ হবে। তাহলে তাদের লাইসেন্স কোচিং করানো যেতে পারে। একইসঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী আমরা কোচের টাকা দিতে পারি। এ ক্ষেত্রে তো এএফসির কোনো বিধিনিষেধ নেই। এ ক্ষেত্রে অর্থই একমাত্র কারণ_ এটি আমি মনে করি না। অর্থ হতে পারে অন্যতম কারণ, কিন্তু একমাত্র নয়।

এসএ সুলতান
সাবেক সভাপতি
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন
বাংলাদেশ ফুটবলের অতীত কিন্তু সবসময়ই মধুর। অন্তত আমার কাছে। কিন্তু কখনও হয়তো সেটার কিছু তিক্ততাও ছিল। সালাউদ্দিন আছেন, তাই বর্তমানটা কিন্তু খুবই উজ্জ্বল। ভবিষ্যৎটা অজানা। এটা ভীতিকর! কী হবে বা না হবে। তবে বর্তমান দেখলে ভবিষ্যতের কথা অনেকটা বলা যায়। তো অতীতের কথা দিয়েই আমি শুরু করছি। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাবস্থায় আমি ফুটবল সংগঠক। আরামবাগ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ক্লাবটি এখনও আমাদের পাড়ায় আছে এবং অনেক বছর শীর্ষ লীগে খেলছে। এখনও ভালো অবস্থানে আছে।
আগের কথায় আমি যেতে চাই না। যতদিন আমি দায়িত্বে ছিলাম আমার মধ্যে একটা প্রবণতা কাজ করেছে যে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাব। সালাউদ্দিন এখানে আছেন। তিনি সাক্ষী তিনি কখনোই ফুটবল ফেডারেশন বা ফুটবল পলিটিক্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চাননি। তিনি যে কিংবদন্তি, সেসব সূত্র ধরেই আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতে অনুরোধ করেছিলাম।
পথ চলতে গেলে অনেক সময় অনেক বিভ্রান্তি ঘটে এবং সেগুলো সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য বলে আমি মনে করি। আর কাজ করতে গেলে সাফল্য-ব্যর্থতা থাকবেই। এখন যদি এককভাবে বলি যে, আমি সব ব্যাপারেই সফল হয়েছি, সেটা সত্যি কথা নয়। তবে কিছু কিছু ব্যাপারে মাইলফলক সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমি প্রয়াস নিয়েছি। সেটা হলো ফিফার স্ট্যাটাস অনুযায়ী একটা সুন্দর গঠনতন্ত্র। এ জন্য ফিফা আমাদের ওপর চাপ দিয়েছিল। একটা গঠনতন্ত্র আমরা উপহার দিয়েছি ফুটবল ফেডারেশনকে। সেই সূত্র ধরেই বর্তমান গঠনতন্ত্রে সভাপতির যে অংশীদারিত্ব, সভাপতির যে দায়িত্ব, সভাপতির যে কর্তব্য_ এটা কিন্তু অনেক উঁচু মানে চলে গেছে।
আমি যখন সভাপতি ছিলাম তখন প্রধান নির্বাহী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। আমি রাজনীতি করতাম। রাজনীতিতে বেশি সম্পৃক্ততা ছিল বলে ইচ্ছা করলেও অনেক কিছু করতে পারতাম না। ফলে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল তখন। সে কারণে হয়তো কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটতে পারে এবং হয়তো কোথাও আমাদের ব্যর্থতাও থাকতে পারে। কিন্তু সফলতার তালিকা অনেক লম্বা। আমি একটু বলতেই চাই। প্রথমে তো গঠনতন্ত্রের কথা বললাম, তারপর দরকার ছিল আমাদের একটি বাসভবন। ফিফা থেকে টাকা দেওয়া ছিল অনেক দিন। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর জমি অধিগ্রহণ এবং একটা সুন্দর বিল্ডিং করা হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্পদের প্রয়োজন ছিল এবং আমাদের সম্পদ বেশ বড়। তারপর যে জিনিসটা খুবই জটিল ছিল তা হচ্ছে মাঠ নিয়ে টানাহেঁচড়া। মিরপুরে আমাদের নির্বাসিত করা হয়েছিল ১৮-২০ বছর। ৮০ সালের পর থেকে ফুটবলের জনপ্রিয়তা অনেক কমে যাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে যা অন্যতম। ২০০১ সাল থেকে জনপ্রিয়তা অনেক নিচে নেমে গেছে। আমরা দর্শক মাঠে টানতে পারছিলাম না। দর্শক মাঠবিমুখ হয়ে গিয়েছিল। আমি এখানে সালাউদ্দিনকে একটা বিশেষ কৃতিত্ব দিতে চাই। সুপার কাপের যে আয়োজনটা তিনি করেছেন, তাতে অভূতপূর্ব একটা সাড়া মিলেছে। এ ধরনের কাজগুলো কিন্তু অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি এবার সাফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা সবাই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। আমরা খুব গর্বিত তাকে নিয়ে। ২০০৩ সালে আমরা সাফের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। আমি তখন বাফুফে সভাপতি। পরের বছর করাচিতেও আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছিলাম। তবে কিছু একটা ভুল হয়েছিল। আমরা দুর্ভাগ্যবশত ফাইনালে হেরে গেছি। তো সেই সাফ আবার ঢাকায় হচ্ছে। আশা করি বাংলাদেশ আবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হবে। সালাউদ্দিনের যোগ্য নেতৃত্বে তা সম্ভব বলেই মনে করি।
এরপর প্রশাসনিক কাঠামোর কথা বলব। প্রশাসনিক কাঠামোতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেটা আমরা শুরু করেছিলাম। আমরা কিন্তু শুরু করে দিয়ে গেছি প্রশাসনটাকে সাজিয়ে নেওয়ার কাজ ফিফা-এএফসির গাইডলাইন অনুযায়ী। এখন এটা প্রায় পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ যদি থাকে, এই প্রতিষ্ঠান যদি থাকে এবং সেটা যদি ভালো নেতৃত্বে চলে, ইনশাআল্লাহ ফুটবল আগামীতে এগিয়ে যাবে। তার কারণ হিসেবে আমি বলছি, আমরা কিন্তু বহু বছর পর ফুটবল ফেডারেশন দ্বারা স্কুল ফুটবল শুরু করছি। যেটা ফুটবলের মূল ভিত্তি। আমি সব সময় বলি, আমাদের গোড়ায় যেতে হবে। শিশুদের নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সেটাকে আমরা কিন্তু শুরু করেছি। আমার বিশ্বাস, সেটা এখনও অব্যাহত আছে। তৃতীয় বিভাগ পাইওনিয়ার থেকে অনেক খেলোয়াড় সৃষ্টি হয়েছে। পাইওনিয়ারটা এ বছর হয়েছে কি-না আমি নিশ্চিত নই। সর্বশেষ তথ্য আমার জানা নেই। তবে পাইওনিয়ার প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, তৃতীয় বিভাগ, বি. লীগ তো চলছেই। আরও একটি বিষয় হচ্ছে আমি সভাপতি থাকার সময়েই দেশে মহিলা ফুটবল চালু হয়েছিল। তাতে আমি অনেক বিপাকে পড়েছিলাম। শুরুতেই খুব বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
আমি এখানে একটু বলি, এই উপমহাদেশে পেশাদার লীগ প্রথম প্রবর্তন আমরাই করে গেছি। আমি করেছি সেটা সাহসের সঙ্গেই। যদিও সেটা বিশাল সফলতা ছিল না, এখনও সেটা খুব বিশালভাবে সফল নয়। কিন্তু একদিন হবে। যেদিন সিটিসেলের মতো সবাই এগিয়ে আসবে, যখন তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে। আমি আশা করি, ফুটবলের পুরো চেহারাই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আমার মনে হয়, ফুটবল সেই করপোরেট প্রতিযোগিতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ফিফা ও এএফসির গাইডলাইনে আরও যাতে ক্লাব সৃষ্টি হয়, ক্লাবগুলোতে যাতে গণতন্ত্রের সৃষ্টি হয় এবং সেই গণতন্ত্র ফুটবল ফেডারেশনের জন্য স্থায়ীভাবে করে দেওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে গেছি। আশা ছিল গণতন্ত্র আসবে, আর্থিক সঙ্গতি আসবে। আমাদের সৌভাগ্য সেই সঙ্গতি সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে এসেছে। আমাদের সময় সেই আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। সেটার কারণ আর আমি বিশ্লেষণ করতে চাচ্ছি না। আমি মনে করি, সেটা আমার নিজেরই একটা ব্যর্থতা। সালাউদ্দিনের যে আর্থিক সঙ্গতি আছে, সেটা আমার সময় ছিল না। যিনি প্রধান নির্বাহী ছিলেন তার ব্যর্থতাও হতে পারে। হতে পারে আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ততটুকু সময় দিতে পারিনি। যাই হোক এ খেলাটিকে ঘিরেই সবার স্বপ্ন, এটা মানুষের খেলা, জনগণের খেলা, এ দেশের প্রাণের খেলা ফুটবল। রাত আড়াইটা-তিনটায় ঘুমিয়ে আবার পাঁচটায় উঠে যে আর্জেন্টিনার খেলাটা দেখতেই হবে, না হলে মনটা ভরবে না_ এটা সেই খেলা। এই যে আমাদের একটা আনন্দ, তা অন্য কোনো খেলায় কখনোই ছিল না। থাকবেও না। এখানে কিন্তু একটা তুলনা প্রায়ই ওঠে_ ফুটবল এবং ক্রিকেট। দুটির মধ্যে আদৌ কোনো তুলনা চলে না। পুরো পৃথিবীর ভেতরে কোথাও এটা তুলনাযোগ্য না। আমাদের সৌভাগ্য আমরা ক্রিকেট শিখেছি, ক্রিকেটে হয়তো ভালো করার চেষ্টা করছি এবং এটাও সত্যি, ক্রিকেটই একমাত্র খেলা যাতে বাংলাদেশ একদিন না একদিন শ্রেষ্ঠ হতে পারে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নও হতে পারে। যদি শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারে, বাংলাদেশের হওয়াটা কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। সেটি আলাদা বিষয়। তবে তা ফুটবলের সঙ্গে তুলনাযোগ্য নয়। ফুটবল পুরো আলাদা বিষয়। ফুটবলে যে চাঞ্চল্য, যে উন্মাদনা সারা পৃথিবীতে তার সঙ্গে ক্রিকেট বা অন্য খেলার কোনো তুলনা নেই।

আমিনুল হক
অধিনায়ক
জাতীয় ফুটবল দল
গোলটেবিল বৈঠকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য দৈনিক সমকালকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। কোচিং পদ্ধতি নিয়ে আমি যে কথা বলতে চাই, তা হচ্ছে স্থানীয় কোচরা ফিফা-এএফসির বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করছেন ঠিকই। কিন্তু তাদের কাছ থেকে খেলোয়াড়রা আধুনিক ফুটবল সম্পর্কে খুব একটা ধারণা পাচ্ছেন না। কারণ, কোর্স করলেও কোচরা সনাতনী আমলের কৌশলেই খেলোয়াড়দের অনুশীলন করিয়ে থাকেন। ফলে কোচদের কোচিং করানো হলেও তার সুফল এখনও সেভাবে চোখে পড়ছে না। এ ধারায় ছেদ টানতে না পারলে ফুটবলে আমরা এগিয়ে আসতে পারব না। কারণ, নিত্যনতুন পন্থা অবলম্বন করে এগিয়ে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। আমরা এখনও তা থেকে অনেক দূরে। উন্নতি করতে হলে দ্রুতই সে দূরত্বটা ঘোচাতে হবে।
খেলাধুলার উন্নয়নে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়। এখান থেকেই একজন খেলোয়াড়কে বেসিক ধারণাটা দিতে হয়, সেটা যে খেলাতেই হোক না কেন। তবে এ বিষয়ে বরাবরই উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের এখানে তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তুলে আনার ধারাটা কেবল শুরু হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে। একজন শিশুকে ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারলেই বাংলাদেশ ফুটবল শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে। আমার মনে হয়, তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় সৃষ্টির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও যত্নবান হওয়া উচিত। এখানে ক্লাবগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে হবে। সে সঙ্গে ক্লাবগুলোর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই একজন খেলোয়াড় মাঠে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারেন। অবশ্য এখানে উলেল্গখ করতেই হয় যে, খেলোয়াড়দের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অতীতের তুলনায় বর্তমানে কিছুটা গুরুত্ব পেয়েছে। আশা করছি, অন্যান্য বিষয়ের মতো এ বিষয়ে দিন দিন উন্নতি হবে। সে ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ফুটবল। এ ক্ষেত্রে ফুটবল ফেডারেশন, সরকার, দর্শক ও সাংবাদিকসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

জাহিদ আহসান রাসেল এমপি
সভাপতি
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত
সংসদীয় কমিটি
প্রথমেই সমকালকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এত সুন্দর একটি আয়োজনের জন্য। পাশাপাশি আমাদের সামনে দু'জন কিংবদন্তি বসে আছেন। একজনকে অবশ্যই আমাদের ফুটবলের রাজা বলতে পারি_ কাজী সালাউদ্দিন। আরেকজন আমাদের সাংবাদিক জগতের কিংবদন্তি; যিনি যে জায়গায়, যে মাপেই থাকুন না কেন উজ্জ্বল করে রাখেন এবং উজ্জ্বল করে রেখেছেন, সেই শ্রদ্ধেয় গোলাম সারওয়ার।
আমি আসলে অল্পদিন ধরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। যদিও আমি খেলাধুলায় আগে থেকেই ছিলাম, যা খেলাধুলার জগতে কাজ করতে গিয়ে আমাকে অনেক সহযোগিতা করছে। আমরা যতই দেখি অন্যান্য খেলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য বয়ে এনেছে, তবে ফুটবল এমন একটি খেলা যার খ্যাতি ও অবস্থানের কখনও নড়চড় করা যাবে না। আমি কিছুদিন আগে আমার জেলায় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিলাম। সেখানে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে ইউনিয়ন এবং থানা পর্যায়ে শেষ করে জেলা পর্যায়ে চূড়ান্ত পর্বের খেলা হয়। সেখানে যে অভূতপূর্ব দর্শক সাড়া দেখেছি, তা অন্য কোনো খেলা দিয়ে সম্ভব হবে কি-না জানি না। আমার কাছে মনে হয় অসম্ভব বিষয়। এত স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দর্শক-সাধারণ মানুষের। সেখানে আমরা খেলোয়াড় সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলাম। আসলে আমাদের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। আমরা অনেক টুর্নামেন্ট আয়োজন করি ঠিকই, কিন্তু দেখা যায় বাইরের খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গঠন করা হয়। সে ক্ষেত্রে ওই এলাকার খেলোয়াড় উঠে আসে না। আমরা নিয়ম করেছিলাম, গাজীপুরের ছেলেদেরই খেলতে হবে। এর মধ্য দিয়েই গাজীপুরের কিছু খেলোয়াড় বেরিয়ে এসেছে। আমরা ভালো ভালো কিছু খেলোয়াড় পেয়েছি।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আলোচনায় এসেছে। যদিও আমি সরকারের সরাসরি প্রতিনিধি বলা যাবে না। কারণ মন্ত্রণালয় ঠিকমতো কাজ করছে কি-না বা আরও ভালো কীভাবে কাজ করতে পারে, আমরা সবসময় তা মনিটরিং করি। এর পাশাপাশি আমি যেহেতু সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য, সে হিসেবেও আমাদের বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বিকেএসপির বিষয় নিয়ে সালাউদ্দিন যা বললেন সেটি শুনে আমার সত্যিই খারাপ লাগছে। কারণ আমার মনে হয়েছিল, বিকেএসপি ফুটবলকে দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় দেখলাম, আর দরকার নেই বা এ ধরনের মন্তব্য। যে বিকেএসপি এখন বন্ধ রয়েছে, কোনো কিছু হচ্ছে না, খেলাধুলা হচ্ছে না_ সেটিকে গরুর হাটই বলা যায়। সে বিকেএসপিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য স্পন্সরের মাধ্যমে বাফুফে সভাপতি যে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, আমাদের উচিত ছিল সে উদ্যোগটাকে কাজে লাগানোর। বিকেএসপির যেসব সমস্যার কথা শুনলাম সেগুলো যদি সত্যি হয়ে থাকে, সেটার অবস্থাই যদি এত খারাপ হয়ে থাকে এবং সে বিষয়গুলোর দিকে যদি নজর দিতে না পারি, তাহলে তো তা খুবই চিন্তার কারণ। আমি আশা করি, এ বিষয়গুলো আমরা সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে পরবর্তী সভায় উত্থাপন করব এবং এ সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, অবশ্যই সে চেষ্টা করব। পাশাপাশি স্কুল ফুটবলের কথাও বলতে হয়। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখন দেখতাম স্কুল ফুটবল এতটা জনপ্রিয় ছিল যে, ইন্টার স্কুল খেলা নিয়ে এলাকায় মারামারি পর্যন্ত হতো। ওই অবস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আমি ফুটবল ফেডারেশনকে আশ্বস্ত করতে চাই, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা দরকার হলে সে বিষয়েও সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।
ট্যালেন্ট হান্টের বিষয়ে বলতে চাই, ট্যালেন্ট হান্টের বাচ্চাদের এনে খেলাধুলার পাশাপাশি তাদের লেখাপড়ার বিষয়টিও দেখতে হবে। আমি যতটুকু জানি বিকেএসপিতে লেখাপড়ার মান ততটা ভালো নয়। বাবা-মায়ের ইচ্ছা থাকে খেলাধুলার পাশাপাশি বাচ্চাদের লেখাপড়ার দিকটাও ভালোভাবে চলুক। এটা যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে অভিভাবকদের খেলাধুলার প্রতি অনীহা থেকেই যাবে। আমি আশা করি, এ বিষয়গুলো আপনারা নিশ্চিত করবেন। এছাড়া আমাদের পক্ষ থেকেও যদি কিছু করার থাকে তাহলে অবশ্যই তা করব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে অনেক আন্তরিক, সেটাও আপনারা জানেন। আমাদের মৃতপ্রায় ফুটবলে যে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, সে জন্য সালাউদ্দিনকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ফুটবল ফেডারেশন ও সিটিসেলকেও ধন্যবাদ জানাই। কারণ সিটিসেল সুপার কাপে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। চেষ্টা থাকলে যে ফুটবল দর্শক মাঠে আসে, সেটাই প্রমাণ করেছে সিটিসেল সুপার কাপ। আপনারা জানেন, সুপার কাপের ফাইনালে রাষ্ট্রপতির থাকার কথা ছিল। তিনি অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফাইনালের দিন উপস্থিত হয়েছিলেন। আমার মনে হয়, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও এমন হবে কি-না সন্দেহ। যেখানে প্রেসিডেন্ট আসার কথা ছিল আসতে পারেননি বলে শুধু কারও মন যেন খারাপ না হয়, উৎসাহ যাতে হারিয়ে না বসে সে কারণে প্রধানমন্ত্রী মাঠে এসেছিলেন আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ না পাওয়ার পরও। এর মাধ্যমে তিনি খেলাধুলার প্রতি আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছেন। আমি যতদূর জানি, জেলা বা জাতীয় পর্যায়ে যদি কোনো দল চ্যাম্পিয়ন হয় তাহলে তাদের এলাকায় মাঠ ও স্টেডিয়াম করে দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সবচেয়ে বড় যা প্রয়োজন, সে কথাটি এখানে আসেনি। তা হচ্ছে মাঠ। ফুটবল খেলার সবচেয়ে বড় অন্তরায় এখন মাঠ। যে কোনোভাবেই হোক আমাদের মাঠের ব্যবস্থা করতেই হবে। মাঠ ছাড়া ফুটবলকে চিন্তাই করা যাবে না। তারপরও যে মাঠ রয়েছে তা নিয়েও কত কিছু হচ্ছে বা হয়েছে। যদিও আমরা এখন নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম ফুটবলেরই থাকবে। ফুটবল খেলাই হবে সারা বছর এখানে।
মারুফুল হক কোচিংয়ের যে বিষয়গুলো বলেছেন, সে প্রসঙ্গে বলি, আমাদের আসলে অনেক ভালো কোচ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এই কোচদের কোথায় ব্যবহার করা হবে?
দেখা যায়, ভালো ভালো দলগুলো দেশের কোচ সেভাবে নেয় না। যার কারণে তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিকেএসপির কোচের যে বেহাল দশার কথা জানলাম, সেটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমরা তো এই কোচদের সেখানে ব্যবহার করতে পারি। আমি বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করব এবং এটা কীভাবে করা যায়, আমার পক্ষ থেকে অবশ্যই চেষ্টা করা হবে। সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে, ফুটবলের পক্ষ থেকে আমি অবশ্যই চেষ্টা করব, ফুটবলে যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে তা যাতে ধরে রাখা যায়। আলোচনায় অনেক পয়েন্ট এসেছে। এ পয়েন্টগুলো আমার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থায় কাজে লাগবে, সে আশাবাদ ব্যক্ত করে আবারও দৈনিক সমকালকে, সারওয়ার সাহেবকে এবং সমকালের সব কলাকুশলীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে আমার কথা শেষ করছি। পাশাপাশি সাফ ফুটবলের নবনির্বাচিত সভাপতি সালাউদ্দিনকে আন্তরিক অভিনন্দন।
রেটিং দিন :
 
( এই লেখাটি পড়েছেন : ২৩১৫ জন )
 
আপনার মতামত দিন
*
*
Bangla Unijoy
Bangla Probhat
Bangla Phonetic
Bangla Phonetic Int.
English
*
* আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন
 
সম্পাদক: গোলাম সারওয়ার
প্রকাশক : এ.কে.আজাদ, ১৩৬, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮
ফোন : ৮৮০২-৯৮৮৯৮২১, ৮৮০২-৯৮৮৭০৫, ৯৮৬১৪৫৭, ৯৮৬১৪০৮, ৮৮৫৩৯২৬ ফ্যাক্স : ৮৮০২-৮৮৫৫৯৮১, ৮৮৫৩৫৭৪
ই-মেইল :
info@samakal.com.bd
Powered By:orangebd